শহীদ শরিফ ওসমান বিন হাদি: জীবন ও রাজনৈতিক সংগ্রাম
লিখেছেন : ফয়জুল্লাহ নোমানী
শরিফ ওসমান বিন হাদি (৩০ জুন ১৯৯৩ – ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫), যিনি ওসমান হাদি বা হাদি ভাই নামেই সমধিক পরিচিত, ছিলেন একজন বাংলাদেশি রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী, বক্তা এবং ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র [১] [২]। ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে তিনি তরুণ প্রজন্মের রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে আবির্ভূত হন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেন। জুলাই শহীদদের অধিকার রক্ষা, আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন এবং ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধীসক্রিয় রাজনীতিতে তার ভূমিকা তাকে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসে [৩] [৪] [৫]। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়, যা বাংলাদেশে ব্যাপক প্রতিবাদ ও প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় [৬]।
প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
ওসমান হাদি ১৯৯৩ সালের ৩০ জুন ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন [৭]। তার বাবা ছিলেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও স্থানীয় ইমাম। ছয় ভাইবোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ [৭]।
হাদি তার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু করেন নলছিটি ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে। পরবর্তীতে তিনি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসায় ভর্তি হন এবং সেখান থেকে আলিম পরীক্ষা সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন [৮]। শিক্ষাজীবনের পাশাপাশি তিনি ইংরেজি শেখার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক হিসেবে কাজ করতেন এবং সর্বশেষ ইউনিভার্সিটি অব স্কলারস নামে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছিলেন [৯] [৮]।
রাজনৈতিক উত্থান ও ইনকিলাব মঞ্চ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় হাদি ঢাকার রামপুরা এলাকায় স্থানীয় সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সমন্বয়ক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন [১০]। অভ্যুত্থানের পর তিনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অন্যতম তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন [১০]।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার অভিজ্ঞতা ও দাবির ভিত্তিতে গঠিত রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম ইনকিলাব মঞ্চ শরিফ ওসমান হাদির হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হয় [১]। এই সংগঠনের মাধ্যমে তিনি ইনসাফভিত্তিক একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গঠন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং সমস্ত আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর লক্ষ্য ঘোষণা করেন [১]। ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর তিনি জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার এবং জুলাই চার্টার ঘোষণার মতো গুরুত্বপূর্ণ দাবিগুলো উত্থাপন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেন [১১]।
|
বৈশিষ্ট্য |
বিবরণ |
|
পূর্ণ নাম |
শরিফ ওসমান বিন হাদি |
|
জন্ম |
৩০ জুন ১৯৯৩ |
|
জন্মস্থান |
নলছিটি, ঝালকাঠি জেলা, বাংলাদেশ |
|
মৃত্যু |
১৮ ডিসেম্বর ২০২৫ (বয়স ৩২) |
|
মৃত্যুর কারণ |
হত্যাকাণ্ড (গুলিবিদ্ধ) |
|
পেশা |
রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী, শিক্ষক |
|
রাজনৈতিক ভূমিকা |
ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র |
|
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান |
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (রাষ্ট্রবিজ্ঞান), ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদ্রাসা |
|
উল্লেখযোগ্য আন্দোলন |
জুলাই গণঅভ্যুত্থান, আওয়ামী লীগ নিষেধাজ্ঞা আন্দোলন, ভারতীয় আধিপত্যবাদবিরোধী আন্দোলন |
সক্রিয় রাজনীতি ও বিতর্কিত অবস্থান
হাদি তার রাজনৈতিক জীবনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন:
এছাড়াও, হাদি সীমান্ত শরিফ ছদ্মনামে ২০২৪ সালে 'লাভায় লালশাক পুবের আকাশ' নামে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন [১৮]।
হামলা ও মৃত্যু
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর, জুমার নামাজের পর ঢাকার বিজয়নগরের বক্স কালভার্ট এলাকায় তিনটি মোটরসাইকেলে আসা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খানের গুলিতে শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন [৬] [১৯]। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়, যেখানে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ১৫ ডিসেম্বর তাকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের মাধ্যমে সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে নেওয়া হয় [২০]।
টানা সাত দিন মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন [৬]। তার মৃত্যুতে বাংলাদেশ সরকার এক দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং তার পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার ঘোষণা দেয় [২১]।
প্রতিক্রিয়া ও উত্তরাধিকার
ওসমান হাদির মৃত্যুর পর ঢাকাসহ সারাদেশে প্রতিবাদী বিক্ষোভ শুরু হয়। রাজধানী ঢাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে [২২]। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং যেকোনো ধরনের গুজব বা হঠকারী সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকার অনুরোধ করেন [২৩]।
শরিফ ওসমান বিন হাদি তার স্বল্পকালীন রাজনৈতিক জীবনে তরুণ প্রজন্মের কাছে সাহস, স্পষ্টতা ও মূল্যবোধের প্রতীক হয়ে ওঠেন। তার জীবন ও সংগ্রাম বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নতুন রাজনৈতিক ধারার উন্মোচন করে [২৪]।
তথ্যসূত্র
[১] "ঢাকা-৮ আসন থেকে নির্বাচন করবেন ইনকিলাব মঞ্চের হাদি"। দৈনিক ইনকিলাব। ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
[২] "ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য প্রার্থী ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ"। দৈনিক প্রথম আলো। ১২ ডিসেম্বর ২০২৫।
[৩] "ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদিকে হত্যার হুমকি"। দৈনিক ইনকিলাব। ১৫ নভেম্বর ২০২৫।
[৪] "আজকের রায় পুরো পৃথিবীর জন্য নজির স্থাপন করেছে : ওসমান হাদি"। ঢাকা পোস্ট। ১৭ নভেম্বর ২০২৫।
[৫] "সুবিচার না পেলে শহীদ পরিবারকে সঙ্গে নিয়ে আইনি লড়াই করবো"। মানবজমিন।
[৬] "ওসমান হাদী আর নেই"। দৈনিক আমাদের সময়। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
[৭] "ওসমান হাদির পরিবারের সবাই আলেম"। ঢাকা মেইল।
[৮] "যেভাবে আলোচনায় আসেন ওসমান হাদি"। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম।
[৯] "বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচিত-সমালোচিত ওসমান হাদি"। বিবিসি বাংলা। ১৪ ডিসেম্বর ২০২৫।
[১০] "আ. লীগকে নিষিদ্ধ করেই বাড়ি ফিরব : শরীফ উসমান হাদী"। কালের কণ্ঠ। মার্চ ২০২৫।
[১১] "ইনকিলাব মঞ্চ গঠনের পর জুলাই অভ্যুত্থানের স্মৃতি রক্ষা, অপরাধীদের বিচার..." (উইকিপিডিয়া থেকে সংগৃহীত)।
[১২] "আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর ইনকিলাব মঞ্চের তিন প্রস্তাব"। প্রথম আলো। ১২ মে ২০২৫।
[১৩] "পুরনো ধারায় রাজনীতি করে ক্ষমতায় টেকা যাবে না: ওসমান হাদী"। বাংলা ট্রিবিউন। ১২ জুলাই ২০২৫।
[১৪] "জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান ইনকিলাব মঞ্চের"। দৈনিক যুগান্তর। ২৪ মে ২০২৫।
[১৫] "ড. ইউনূসকে প্রধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের দাবি ইনকিলাব মঞ্চের"। ঢাকা পোস্ট। ৭ আগস্ট ২০২৫।
[১৬] "ভোট 'ভিক্ষা' করেই আমি পার্লামেন্টে হাজির হবো : ওসমান হাদী"। কালের কণ্ঠ। নভেম্বর ২০২৫।
[১৭] "নির্বাচনী প্রচারণায় হাদির ওপর ময়লা পানি ছুড়ল কারা?"। কালবেলা।
[১৮] "বইমেলায় সীমান্ত শরিফের 'লাভায় লালশাক পুবের আকাশ'"। সানবিডি২৪। ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৪।
[১৯] "হাদিকে গুলি করে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা ফয়সাল"। দৈনিক জনকণ্ঠ।
[২০] "ওসমান হাদিকে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে সিঙ্গাপুর নেওয়া হলো"। প্রথম আলো। ১৫ ডিসেম্বর ২০২৫।
[২১] "ওসমান হাদির মৃত্যুতে একদিনের রাষ্ট্রীয় শোক"। দৈনিক প্রথম আলো। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
[২২] "ওসমান হাদির মৃত্যুতে ঢাকায় বিক্ষোভ, ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ"। বিবিসি বাংলা। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
[২৩] "ওসমান হাদির মৃত্যুতে জাতির উদ্দেশ্যে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের ভাষণ"। প্রথম আলো। ১৮ ডিসেম্বর ২০২৫।
[২৪] "Who was Osman Hadi; why is Bangladesh on fire over his death"। Facebook (Al Jazeera)।