ফয়জুল্লাহ নোমানী | প্রতিবাদ
০১|০১|২০২৬ খ্রিঃ
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে দেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। এবারের নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা, বড় একটি দলের অনুপস্থিতি এবং বিপুল সংখ্যক প্রার্থীর উপস্থিতি—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মাত্রার বাস্তবতা তৈরি হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৫৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রয়েছে। এর মধ্যে ৫১টি রাজনৈতিক দল এবারের নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছে। অপরদিকে ৮টি নিবন্ধিত দল কোনো আসনেই প্রার্থী দেয়নি।
এবারের নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি আসনে প্রার্থী দিয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি ৩৩০টির বেশি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে। জোটগত সমঝোতার পাশাপাশি নিজস্ব সাংগঠনিক শক্তির ওপর ভর করে প্রায় সারাদেশেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে দলটি।
দীর্ঘ সময় পর বড় পরিসরে নির্বাচনে ফিরেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটি ২৭০টির বেশি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের এই অংশগ্রহণ নির্বাচনের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরও বহুমাত্রিক করেছে।
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এবারের নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি দেখিয়েছে। দলটি প্রায় ২৬৮টি আসনে মনোনয়ন দাখিল করেছে। ধর্মভিত্তিক ভোটব্যাংকে দলটির সক্রিয়তা ইতোমধ্যে আলোচনায় এসেছে।
অপরদিকে জাতীয় পার্টি (জাপা) ২২৪টি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছে। সব আসনে প্রার্থী না দিয়ে কৌশলগতভাবে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে দলটি।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, কমিউনিস্ট পার্টি অব বাংলাদেশ (সিপিবি), আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) এবং ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি)। এসব দল সীমিত থেকে মাঝারি সংখ্যক আসনে প্রার্থী দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব দলের অংশগ্রহণ অনেক আসনে ভোট বিভাজনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না ৮টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল। দলগুলো হলো—
বিকল্পধারা বাংলাদেশ, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট (বিএনএম), বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (মার্কসবাদী), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টিসহ আরও একটি ছোট দল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংগঠনিক দুর্বলতা, কৌশলগত সিদ্ধান্ত এবং নির্বাচন পরিবেশ নিয়ে অনাস্থাই অংশ না নেওয়ার প্রধান কারণ।
এবারের নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি। দলটির নিবন্ধন ও কার্যক্রম সংক্রান্ত আইনি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না।
আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে রাজনৈতিক মাঠে নতুন শক্তির সমীকরণ তৈরি হয়েছে। বহু আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এখন একাধিক দলের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছে, যা ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
এবারের নির্বাচনে ৪৭৮ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। অনেক আসনে দলীয় প্রার্থীদের পাশাপাশি একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ভোটের লড়াই আরও জটিল হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী মনোনয়ন বাছাই, আপিল নিষ্পত্তি, প্রার্থিতা প্রত্যাহার ও প্রতীক বরাদ্দ শেষে ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হবে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। প্রচার চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা পর্যন্ত। এরপর ১২ ফেব্রুয়ারি ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক অঙ্গনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি বহুদলীয় কিন্তু ভিন্ন বাস্তবতার নির্বাচন—যার ফলাফল দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করবে কি না, সে দিকেই এখন সবার দৃষ্টি।